প্রথমপাতা ফিচার বালিয়াটিতে জমিদার নেই শাসন করছে সিংহ!

বালিয়াটিতে জমিদার নেই শাসন করছে সিংহ!

90
0
১৯৫০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে উপমহাদেশে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও ইতিহাস থেকে সে ভয়াবহ শোষণ-নিপীড়নের কথা মুছে যায়নি। বাংলার জমিনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ইট-পাথরের শতবর্ষ পুরনো দালানগুলো যেন সেই শোষণ-নিপীড়নের সাক্ষীই দিয়ে যাচ্ছে। তেমনিভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জ জেলার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।
জমিদার বাড়ির কথা শুনলে পাঠক মনে প্রজা নিপীড়ন আর শোষণ-বঞ্চনার কথা ইতিহাস থেকে জাগ্রত হয়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে বিভিন্ন অজানা কৌতূহলও মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায়। জানতে ইচ্ছে করে শতবর্ষ প্রাচীন এসকল ইমারতের নির্মাণশৈলী, অপরূপ কারুকার্য আর অন্দরমহলের গোপন কথা সম্পর্কে। বালিয়াটি জমিদার বাড়ির কিছু জানা-অজানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আজকের পর্বটি সাজিয়েন আরিফ হোসেন সবুজ 

প্রাক-কথন

মানিকগঞ্জ জেলার পুরাকীর্তির ইতিহাসে বালিয়াটির জমিদারদের অবদান উল্লেখযােগ্য । বালিয়াটির জমিদারেরা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বৎসর ধরে বহু কীর্তি রেখে গেছেন যা জেলার পুরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে । তৎকালীন মানিকগঞ্জ থানার অন্তর্গত বিনােদপুর গ্রামে ঘনেশ রাম নামে এক হিন্দু সাহা শ্রেণির লােক ছিলেন । তার চার পুত্রের মধ্যে একজন , গােবিন্দরাম বালিয়াটি গ্রামে বিয়ে করে উক্ত গ্রামেই বসবাস করতে থাকেন । আনন্দরাম , দধিরাম , পণ্ডিতরাম ও গােলাপরাম নামে গােবিন্দরামের চার সন্তান হতে প্রসিদ্ধ গােলাবাড়ি , পূর্ব – পশ্চিম বাড়ি , মধ্য বাড়ি ও উত্তর বাড়ি নামে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি সৃষ্টি হয় । বালিয়াটির পাঠান বাড়ির জমিদার নিত্যানন্দ রায় চৌধুরীর দুই ছেলে বৃন্দাবন চন্দ্র রায় চৌধুরী এবং জগন্নাথ রায় চৌধুরীর মাধ্যমে বালিয়াটির নাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল । বালিয়াটিতে আজো দুই বেলা রাধা বল্লভ পূজা হচ্ছে । বালিয়াটিতে ১৯২৩ সালের দিকে জমিদার কিশােরীলাল রায় চৌধুরী নিজ ব্যয়ে একটি এলােপ্যাথিক দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন । বর্তমানে এটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে । জমিদার হীরালাল রায় চৌধুরী সাটুরিয়া থেকে বালিয়াটির প্রবেশ পথের পাশে কাউন্নারা গ্রামে একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন এবং সেখানে দিঘির মাঝখানে একটি প্রমােদ ভবন গড়ে তােলেন যেখানে সুন্দরী নর্তকী বা প্রমােদ বালাদের নাচগান ও পানাহার চলতাে । বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ করছে ।

যা দেখতে পাবেন

জমিদার বাড়ির প্রবেশ ফটকের দুই পাশে স্থাপিত রয়েছে দুটি সিংহের মূর্তি। দেখলে মনে হতে পারে এখনও সগৌরবে শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে সিংহদ্বয়ের প্রভু সম্প্রদায়। বাস্তবে কিন্তু তা নয়, বর্তমানে সিংহমূর্তি দুটিই এখানকার জমিদার, দ্বার রক্ষক।

সমস্ত জমিদার চত্বর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ঘিরে তৈরি করা প্রাচীন আমলের সেই প্রাচীর এখনো টিকে আছে। জমিদার বাড়ির মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই সুপ্রশস্ত সবুজে ঢাকা আঙ্গিনা চোখে পড়ে। আঙ্গিনায় গড়ে তোলা হয়েছে সুন্দর ফুলের বাগান। আঙ্গিনার পরেই পাশাপাশি চারটি বহুতল ভবন রয়েছে।পূর্ব দিকের একই রকম একটি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ভবনগুলোর পেছনেই আছে একটি সুবিশাল পুকুর ও জমিদার অন্দরমহল। শানবাঁধানো ছয়টি ঘাট আছে পুকুরের চারপাশে। প্রাসাদের কক্ষ সংখ্যা ২০০ টি এবং প্রতিটি কক্ষেই সুনিপুণ কারুকাজ লক্ষ্য করা যায়। চুন-সুরকি, লোহার পাত আর কাদামাটিতে নির্মিত ভবনগুলোর প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু। অনন্য নির্মাণ কৌশল আর কারুকার্য পূর্ণ বালিয়াটি জমিদার বাড়ি তৎকালীন জমিদারদের অভিজাত্যকেই ফুটিয়ে তোলে।

বালিয়াটি প্রাসাদ (মধ্যবাড়ি)

বালিয়াটি প্রাসাদটি স্থাপত্যকৌশলের অন্যতম নিদর্শন। সুবিশাল প্রাসাদটি পাঁচটি স্বতন্ত্র ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত। যার মধ্যে পূর্বদিকের একটি ব্লক ছাড়া চারটি ব্লকের দুটিতে একটি দ্বিতল ভবন এবং একটি টানা বারান্দা বিশিষ্ট ত্রিতল ভবন রয়েছে। প্রাসাদটির পেছনে অন্দরমহল। উত্তরদিকের ভবনটি কাঠের কারুকার্যে তৈরি। সুবিশাল প্রাসাদটির চারপাশেই সুউচ্চ দেয়াল। প্রতিটি অর্ধ-বৃত্তাকার খিলান আকৃতির সিংহ খোদাই করা তোরণ বিদ্যমান।

গোলাবাড়ি

জমিদারবাড়িটির ঐতিহ্য শুরু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। আর এই গোলাবাড়িটি লবণের একটি বিশাল গোলা ছিল বলেই ধারণা করা হয়। জমিদাররা ধর্মপ্রাণ হওয়ায় বাড়ির মন্দিরে পূজা অর্চনা করা হতো। স্বাধীনতা যুদ্ধে এখানে লুটপাট করা হয়।

 

উত্তর বাড়ি

জমিদারবাড়ির উত্তর অংশে অবস্থান বলেই বাড়িটির নাম উত্তর বাড়ি। ১৮৮৪ সালে পশ্চিম বাড়ি জমিদারের উত্তরাধিকার জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী বিখ্যাত জগন্নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

 

পূর্ব-পশ্চিম বাড়ি

বালিয়াটির পূর্ব-পশ্চিম অংশে এ বাড়ির অবস্থান বলেই এ বাড়ির নামকরণ করা হয় পূর্ব-পশ্চিম বাড়ি। এ বাড়ির প্রথম জমিদার পুরুষ রায় চাঁন। তিনি দুটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তানদের সম্পত্তির দশ আনা অংশ এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সন্তানদের দান করেন ছয় আনা অংশ। দশ আনির জমিদার বাড়িটিই বর্তমানে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। এখানে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত চারটি সুবৃহৎ অট্টালিকা বিদ্যমান। এগুলো বড় তরফ, মেঝো তরফ, নয়া তরফ এবং ছোট তরফ নামে পরিচিত। ছয় আনির জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব বর্তমানে নেই।

এছাড়াও, মূল ভবনগুলোর সামনের দেয়ালজুড়ে নানা রকম কারুকাজ আর মূর্তি চোখে পড়ে। বর্তমানে বালিয়াটি জমিদারবাড়ির অবস্থা খুবই করুণ। সংস্কারের অভাবে দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি।

 

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে জনসেবা বা এসবি লিংক গেটলক পরিবহনের বাসে করে মাত্র দুই ঘণ্টায় সাটুরিয়া পৌঁছে যাওয়া যায়। বাসভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৭০ টাকা। সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩০ টাকা রিকশা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন বালিয়াটি জাদুঘর।

জমিদার বাড়ি কখন খোলা/বন্ধ থাকে

গ্রীষ্মকালঃ সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত

শীতকালঃ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি পরিদর্শনের সময়।

বন্ধঃ রবিবার পূর্ণদিবস ও সোমবার অর্ধদিবসসহ সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। ঈদের পরের দিনও এই প্রাসাদ বন্ধ থাকে।

টিকেট মূল্য

বালিয়াটি জাদুঘরের জনপ্রতি টিকেটের দাম দেশী  দর্শনার্থীদের জন্য ১০ টাকা এবং বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য ১০০ টাকা।

আপনার অভিমত/মন্তব্য জানাতে পারেন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্যটি লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন