প্রথমপাতা মুক্ত মতামত প্রিয়া – ট্রাম্পের হ্যান্ডশীপ ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি : সাহাবউদ্দিন ফাহিম

প্রিয়া – ট্রাম্পের হ্যান্ডশীপ ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি : সাহাবউদ্দিন ফাহিম

214
0

বর্তমান যুগ আকাশ সংস্কৃতির যুগ। এই যুগে যে কোন মানুষ সহজে ভাইরাল হতে পারে। আমরা বাঙ্গালী, আমরা স্বভাবতই আবেগপ্রবণ। আমরা নিজে নিজেই শতবিষয়ের একক গবেষক! ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা সেই বহিঃপ্রকাশ করি। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন বা চরিত্র বিভিন্নভাবে দূষিত হলেও ফেসবুকে আমরা অনেকটা বিটিভির মত নিজেকে জাহির করি। সেইজন্য কবি নজরুল বলেছেন- “আমরা পাপি,নিজের পাপের বাটখারায় অন্যের দোষ মাপি।” প্রিয়া ও ট্রাম্প হ্যান্ডশীপ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ব্যাখ্যাটি কবির উত্তির মত না হয়ে আসল পাপের ব্যাখ্যার মত হয়েছে। নিজ দেশ বা মাতৃভূমি কে অপমান করা পাপ থেকেও বেশি! অর্থাৎ মহাপাপ!! হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিস্টান ভাই-ভাই নীতির এই মাতৃভূমি কে প্রশ্নের মুখোমুখি করা সহজ কোন বিষয় নয়!  এটি একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ! বঙ্গবন্ধু বলেছেন- “এই দেশ হিন্দুর না,এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশ যে নিজের বলে ভাববে,এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন আনন্দে ভরে উঠবে এই দেশ তার। এই দেশ তাঁদের, যারা এই দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে ও ভবিষ্যতেও দেবে।”

কট্টরপন্থী বর্তমান বিশ্বের ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত বিশ্বনেতা ট্রাম্পের কাছে করা অভিযোগ নিতান্তই সত্য নয়। ট্রাম্প নিজেও সংখ্যালঘু ফিলিস্তিন রাষ্টের মুসলিমদের অশান্তির আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন।  ফিলিস্তিনিদের অধীন মুসলিমদের পবিত্রভূমি জেরুজালেম কে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইহুদী রাষ্ট ইসরাইলের রাজধানী ঘোষনা করেন এবং ২০১৯ সালে ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব থেকে জেরুজালেম স্থানান্তরের আদেশ দেন। আজ বিশ্বের আলোচিত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে ট্রাম্পেরা কৌশলগতভাবে নিশ্চুপ! কাশ্মীর সংকট সমাধান নিয়ে বিশ্বনেতারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কোনঠাসা! সিরিয়ার শিশু আইলান কুর্দিদের নিয়ে ট্রাম্পেরা কার্যকর ব্যাবস্থা গ্রহন করতে পারে নি। ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার দেওয়া অভিযোগ সত্যিই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বাংলাদেশ সংবিধানের ৪নং মূলনীতি হচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি অনুসারে সকল ধর্মের মানু্ষ সমাধিকারের ভিত্তিতে অত্যান্ত শান্তি ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারায় জীবনযাপন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুরা যেভাবে নির্যাতিত হয় সে হিসাবে আমাদের দেশে ০.০৫ % এর বেশি নয়! যদিও সেটা অপ্রত্যাশিত! আমি মনে করি আমাদের দেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার বিষয়টি প্রথমত সামাজিক অসংগতির কারনে হয়। যেমন- আমাদের দেশের অনেক জায়গায় হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান একসাথে বসবাস করে। কাছাকাছি বসবাসের কারনে অনেকে পারিবারিক জামেলা বা জমিজামার জামেলায় জড়িয়ে পড়ে কিন্তুু পত্রপত্রিকায় সেটি “সংখ্যালঘুদের উপর হামলা” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কারনটি রাজনীতির, এই দেশে সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আলাদা আলাদা চর্চা হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো জনপ্রিয়তার স্বার্থে বা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে পরাস্থ করার জন্য সংখ্যালঘুদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে,যা আমরা সচেতন সমাজ বুঝি।

প্রিয়া সাহা ট্রাম্পকে সাজিয়ে খুছিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন সেটা এমনই- প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ হিন্দু-বৌদ্ধ – খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। সমাবেদনা জানিয়ে প্রিয়া সাহার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হাত বাড়িয়ে দিলে প্রিয়া ট্রাম্পের হাতে হাত রেখে বলেন,এখনও সেখানে ১ কোটি ৮০ লক্ষ সংখ্যালঘু রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা দেশ ছাড়তে চাই না। সেখানে আমরা ঘরবাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। জমিজামা দখল করে নিয়েছে। অতপর ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করলেন, কারা এটা করছে? প্রিয়া সাহা বলেন, মুসলিম মৌলবাদীরা। তারা সবসময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সবসময়। আজ যদি প্রিয়া সাহা না হয়ে প্রিয়া বেগম, প্রিয়া আত্তার বা প্রিয়া খাতুন হইতো তাহলেই প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যেত! সুশীল নামের কিছু কিছু অ-ভদ্ররা মুসলিমের চৌদ্ধগৌষ্ঠির বারোটা বাজাতো। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৌশলগত ভাবে বিষয়টা মোকাবেলা করছেন এবং প্রিয়া সাহার ব্যাপার তৌড়জোড় করতে নিষেধ করেন । রাষ্টদ্রৌহী কাজ করার পরেও প্রিয়া সাহার নিরাপত্তায় আমরা ব্যস্ত! প্রিয়া সাহার বিপক্ষে মামলা করায়, তারুণ্যের বর্তমান আইকন ব্যারিস্টার সুমনও মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হচ্ছে!! এতে কি বুঝা যায় না আমাদের দেশে হিন্দু -বৌদ্ধ -খ্রিস্টান সবার স্বক্ষমতা আছে?

উল্লেখ্য, বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুসারে,১৯৪৭ এ ভারত ভাগের পর থেকে এ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ও এখনকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যা কখনই দেড়কোটি ছাড়ায় নি। ১৯৫১ সালের আদমশুমারী অনুসারে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ৯৭ লক্ষ ৬ হাজার, ১৯৬১ সালের আদমশুমারী অনুসারে ৯৯ লক্ষ ৫০হাজার, ১৯৭৪ সালের আদমশুমারী অনুসারে ১ কোটি ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার এবং সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে ১ কোটি ৩৮ লক্ষ। অর্থাৎ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কখনই ৩ কোটি ৭০ লক্ষের অর্ধেকেও ছিল না! ১৯৪৭ এর দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনেকে ধর্মীয় কারনে দেশান্তরী হয়েছে।

প্রিয়া সাহার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুল উপজেলার মাটিরাঙা ইউনিয়নে তার নিজের ঘরবাড়ি নেই। ভাই ও আত্মীয় স্বজনের ঘরবাড়ি রয়েছে। পাশবর্তী চিতলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান শামীম এর সাথে প্রিয়া সাহার বিরোধ রয়েছে। প্রায় জামেলা হয় দুপক্ষের। এ বছর মার্চ মাসে প্রিয়া সাহার সমর্থকরা শামীম পক্ষের সংখ্যালঘুদের তিন চারটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তাঁর একদিন পর প্রিয়া সাহার ভাইয়ের অব্যবহৃত ঘরে আগুন দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর মামলা দেওয়া হয়। প্রিয়া সাহার দায়ের করা মামলায় হিন্দুসম্প্রদায়ের লোকেরাও আসামী ছিল এবং জেল খাটেন। তার বাড়িঘর ও জমি দখলের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দেশদ্রোহী সৃষ্টি হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীতে প্রিয়া সাহা সে পথে নাম লিখালো। মীর্জাপর, ঘসেটি বেগম ও মোশতাকদের মত দেশের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র বা দেশকে অপমান করা দেশদ্রোহীতার শামীল!

পরিশেষে, যারা প্রিয়া সাহাকে সার্পোট দিয়েছেন এবং যারা শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় প্রিয়া সাহাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়েছেন তারা আমার কাছে ধর্মান্ধ! আমার কাছে ধর্মের আগে মা ও মাতৃভূমি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর আমরা মা ও মাতৃভূমি কে পাই, আমি মনে করি মানুষের আসল পরিচয় সে মানুষ! সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শব্দটি আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। আসুন আমরা মাতৃভূমি কে কূলষিত না করে ভালবাসি।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার অভিমত/মন্তব্য জানাতে পারেন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্যটি লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন