প্রথমপাতা বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বছর রাকসু নির্বাচন হবে কী?

চলতি বছর রাকসু নির্বাচন হবে কী?

14
0

মুজাহিদ হোসেন,রাবি: প্রায় ২৯ বছর পর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন নিয়ে সরব হয়েছে ক্যাম্পাসে ক্রীয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনও চলতি বছরের শুরুতে রাকসু নির্বাচন উপলক্ষে কমিটিও গঠন করে দিয়েছে।

ইতিমধ্যেই রাকসু সংলাপ কমিটি ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক এবং সে¦চ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে। তবে সংলাপ যে ধারাবাহিকতায় চলছে তাতে করে এ বছরে রাকসু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা।

রাকসু সংলাপ কমিটি সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি কমিটি গঠনের পরে এ পর্যন্ত ১২টি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন এবং নয়টি অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন আরও চারটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলবে। এরপর হল প্রশাসন, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে রাকসু নিয়ে আলোচনায় বসবে সংলাপ কমিটি।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রফেডারেশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ করে রাকসু কমিটি শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় একই মাসের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, ১৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। অন্যদিকে রাকসু সংলাপ কমিটি ৪ মার্চ ছাত্র মুক্তিজোট ও জাতীয় ছাত্র সমাজ, ৫ মার্চ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ১২ মার্চ, ছাত্রলীগ ২৪ মার্চ সংলাপ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসে। এছাড়া অরাজনৈতক সংগঠন স্টুডেন্ট রাইটস এ্যাসোসিয়েশন ও ক্যারিয়ার ক্লাব ৪ এপ্রিল, হায়ার স্ট্যাডি ক্লাব, ওয়ার্ল্ড লিংকআপ ১৭ এপ্রিল, পাঠক ফোরাম ও আদিবাসী ছাত্র পরিষদ ২৫ এপ্রিল এছাড়াও স্বপ্ন মনোবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গে ২৯ এপ্রিল আলোচনায় বসেছে রাকসু সংলাপ কমিটি। এছাড়া রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং উত্তরণ লেখক ও পাঠকের সূতিকাগারের সঙ্গে ছুটির আগে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংলাপ কমিটি।

বিশ^বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এদিকে আগামী ৮ মে থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন অবকাশ, শব-ই-কদর ও ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে ৪৭ দিন ছুটিতে থাকবে বিশ^বিদ্যালয়। ছুটির পরেই আলোচনায় বসার কথা রয়েছে হল প্রশাসন, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। এছাড়া রয়েছে ভোটার হালনাগাত, তফসিল ঘোষণা, রাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন।

তবে এভাবে ধারাবাহিক সংলাপকে ‘কালক্ষেপন’ হিসেবে দেখছেন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তাদের দাবি, দ্রুত সময়ে সংলাপ শেষ করে রাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হোক।

জানতে চাইলে রাবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বেশকিছু দাবি জানিয়েছি। সব সংগঠনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি খুবই ভাল উদ্যোগ। এই আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্ততে পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু আলোচনার মাত্রাটা যদি ছয়মাস বা এক বছরে লাগিয়ে দেয় তাহলে এই আলোচনার ফলাফল আমাদের কাছে বোধগম্য হবে না। আলোচনা একটা সংগঠনের সাথে করার পরের দিন আরেকটা সংগঠনের সঙ্গে করতে পারে। কিন্তু একটা সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শেষে আটদিন বা দশদিন পরে অন্য একটি সংগঠনের সঙ্গে বসছে সংলাপ কমিটি।

‘‘এতে প্রশাসনের কালক্ষেপনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাবি সংসদ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি শাকিলা খাতুন বলেন, রাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের কোন আন্তরিকতা নেই। ইচ্ছে করেই দেরি করছে। ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। এপ্রিল মাস শেষ তবুও কোন ভূমিকা নেই। সব সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনার নাম করে কালক্ষেপন করছে প্রশাসন। আলোচনা করে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। নির্বাচন দেওয়ার কোন উদ্যোগও দেখছি না। নির্বাচন না দেওয়ার পায়তারা করছে। তবে আমরা আশাবাদী বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত নির্বাচন দিবে।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী রাবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায় বলেন, রাকসু নির্বাচন নিয়ে একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। আসলে নির্বাচনটা আদৌও হবে কিনা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সময়ক্ষেপনের জন্যই এভাবে সংলাপ করছে। কিন্তু সব সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে সংলাপ করলে হয়তো দ্রুত নির্বাচন করা সম্ভব হতো। কিন্তু তা না করে একে একে সব সংগঠনকে নিয়ে সংলাপ করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে প্রশাসন নির্বাচন না করার পায়তারা করছে। এতে করে মনে হচ্ছে এ বছর নির্বাচন হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে এর জন্য দায়ী বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।

জানতে চাইলে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রশাসনকে দেওয়া স্মারকলিপির প্রথম দাবি ছিল দ্রুত রাকসু নির্বাচন দেওয়া। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন সংলাপের কথা বলে কালক্ষেপন করছে। এছাড়া বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই সব সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে ডেকে দ্রুত নির্বাচন করার পরিবেশ তৈরী করতে পারে। কিন্তু প্রশাসন তা না করে একে একে সকল সংগঠনের সাথে আলোচনায় বসেছে। যদি বিশ^বিদ্যালয় কালক্ষেপন করে সংগঠনের পক্ষ থেকে কঠোর কর্মসূচি দিবো। এভাবে চলতে থাকলে এ বছরে কোনভাবেই নির্বাচন সম্ভব নয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সংলাপ কমিটির সভাপতি ও বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর রাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক প্রায় ২৩টি সংগঠন ও হল প্রশাসন, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে রাকসু নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে ছাত্র সংগঠনগুলো যেসব দাবিগুলো উপস্থাপন করেছে তা পর্যালোচনা করে রাকসু গঠনতন্ত্রের সঙ্গে মিল রেখে তা বিবেচনা করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে অনুযায়ী প্রত্যেক বছর রাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৪ বার। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯-৯০ মেয়াদের জন্য। এরপর যে দল সরকারে ছিল তাদের ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য বজায় রাখতে দেয়া হয়নি রাকসু নির্বাচন। দীর্ঘদিন রাকসু নির্বাচন না দেয়ায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের নেতারা জড়িয়ে পড়েছেন হলের সিট বাণিজ্য, হল দখল, টেন্ডাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কেউ নেই, অন্যদিকে ভালো নেতৃত্বও তৈরি হয়নি।

আপনার অভিমত/মন্তব্য জানাতে পারেন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্যটি লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন